
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাম্প্রতিক সফর এবং কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল গুঞ্জন। মাঠ পর্যায়ের বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি (NCP) এর জন্য এক ধরণের ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে রাজপথের প্রধান শক্তি বিএনপিকে কেবল ‘আশ্বাস’ বা ‘মূলা’ দেখিয়ে শান্ত রাখা হচ্ছে।
কুমিল্লায় সেনাপ্রধান: রুটিন সফর নাকি সুনির্দিষ্ট মিশন?
আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান হেলিকপ্টারযোগে কুমিল্লায় পৌঁছান। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় মোতায়েনরত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন বলা হচ্ছে, তবে কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের সাথে তার দীর্ঘ বৈঠক ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে নির্বাচনের সময় মাঠ পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু দলের কার্যক্রম ও নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়েছে।
জামায়াত-শিবির ও এনসিপি’র ‘মৌন সমর্থন’?
চট্টগ্রাম বিভাগ বরাবরই জামায়াত-শিবিরের শক্ত ঘাঁটি। সাম্প্রতিক আসন বণ্টন এবং নির্বাচনী মাঠে জামায়াত ও এনসিপি’র প্রার্থীদের হঠাৎ সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশাসনের বর্তমান অবস্থানে মনে হচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং এনসিপি জোটগত বা সমঝোতার ভিত্তিতে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৮ ও চট্টগ্রাম-১৫ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে জামায়াত প্রার্থীদের প্রার্থিতা ও এনসিপি’র সাথে তাদের কৌশলগত মিত্রতা এই ধারণাকে আরও জোরালো করছে।
বিএনপিকে ‘মূলা’ প্রদর্শন: আশ্বাসে বন্দি মাঠের রাজনীতি :
অন্যদিকে, রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে নিয়ে এক ধরণের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি অবলম্বন করছে প্রশাসন। বিএনপিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তাদের প্রার্থীদের ওপর ধরপাকড় ও আইনি জটিলতা এখনও বিদ্যমান। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ভাষায়, বিএনপিকে নির্বাচনের মূল স্রোতে রাখার জন্য ‘সুষ্ঠু ভোটের মূলা’ দেখানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তলে তলে চট্টগ্রাম বিভাগের নিয়ন্ত্রণ জামায়াত-শিবির ও এনসিপি’র হাতে তুলে দেওয়ার নীল নকশা বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লার স্থানীয় এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আমাদের শুধু আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে তারা অন্য কারো হয়ে কাজ করছেন।" অন্যদিকে, এনসিপি ও জামায়াত শিবিরে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সেনাপ্রধানের সফরের পর এই আত্মবিশ্বাস আরও কয়েক গুণ বেড়েছে বলে মনে করছেন কর্মীরা।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের এই সফর কি কেবলই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ, নাকি চট্টগ্রাম বিভাগে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ? ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নটিই এখন সবচাইতে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি সত্যিই জামায়াত-শিবির ও এনসিপি জোটকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের ফলাফল চট্টগ্রামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট চিরতরে বদলে দিতে পারে।